নিজস্ব সংবাদদাতা, রানীগঞ্জ -: ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ভাগনাডিহির মাটি থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদার-মহাজন ও সুদখোরদের নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে যে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন বীর সাঁওতাল নেতা সিদো মুর্মু ও কানহু মুর্মু, সেই ‘সাঁওতাল হুল’ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অমর প্রতীক। তাঁদের সংগ্রামের সহযোদ্ধা চাঁদ মুর্মু, ভৈরব মুর্মু, ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মুর আত্মত্যাগ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
সেই অমর ইতিহাসকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে মঙ্গলবার পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানীগঞ্জের নিমচা কোলিয়ারি আদিবাসী এলাকায় মুর্গাথোল পাঁচপাড়ার উদ্যোগে মর্যাদা ও আবেগঘন পরিবেশে পালিত হলো হুল দিবস। সকাল থেকেই নিমচা আদিবাসী জনপদ যেন ইতিহাসের আবহে ফিরে যায়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী ও প্রবীণদের ঢল নামে অনুষ্ঠানে। হাতে ছিল সাঁওতাল সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী তীর-ধনুক, আর ধামসা ও মাদলের বজ্রগম্ভীর তালে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
মুর্গাথোল থেকে শুরু হওয়া বিশাল পদযাত্রা নিমচা এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পরিক্রমা করে লাল ময়দানে এসে শেষ হয়। পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হয় হুল বিদ্রোহের বীর শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন স্লোগান। পথের দুই ধারে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ এই ঐতিহাসিক শোভাযাত্রার সাক্ষী থাকেন।
লাল ময়দানে পৌঁছে বীর শহীদ সিদো মুর্মু, কানহু মুর্মু, চাঁদ মুর্মু, ভৈরব মুর্মু, ফুলো মুর্মু ও ঝানো মুর্মুর মূর্তিতে মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। উপস্থিত মানুষের চোখেমুখে ফুটে ওঠে গর্ব, আবেগ এবং আত্মপরিচয়ের অনুভূতি। বক্তারা বলেন, ইতিহাসকে কেবল স্মরণ করাই নয়, আগামী প্রজন্মের কাছে হুল বিদ্রোহের প্রকৃত চেতনা পৌঁছে দেওয়াই আজকের অন্যতম দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে অল আদিবাসী কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভাপতি জনার্দন কোড়া বলেন,
হুল দিবস কোনও উৎসবের দিন নয়, এটি আত্মত্যাগকে স্মরণ করার দিন। সিদো-কানহু, চাঁদ-ভৈরব, ফুলো-ঝানো অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে যে সংগ্রামের সূচনা করেছিলেন, তা আজও আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায়। আমরা চাই আগামী প্রজন্ম এই ইতিহাস জানুক, আত্মমর্যাদার এই লড়াইকে ধারণ করুক।
স্থানীয় বাসিন্দা রামলাল টুডু বলেন,
হুল দিবস আমাদের আত্মপরিচয়ের দিন। এই ইতিহাস শুধু অতীত নয়, আমাদের অস্তিত্বের অংশ। তাই প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিনটি পালন করেছি। ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্য অটুট থাকবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রদীপ বাউরি, সুরজ প্রসাদ, রতন বাউরি, রাজু মাহালী-সহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুল সংখ্যক আদিবাসী নারী-পুরুষ।
শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, নিমচার হুল দিবস ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মমর্যাদার এক জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ। ধামসা-মাদলের প্রতিটি তালে, তীর-ধনুক হাতে প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আবারও উচ্চারিত হলো সাঁওতাল হুলের সেই অমর বার্তা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই স্বাধীনতার প্রথম শপথ, আর শহীদদের আত্মত্যাগ যুগে যুগে মানুষের সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শপথ, হুল দিবসে নিমচায় বীর শহীদদের শ্রদ্ধার্ঘ্য
Reviewed by Bengal Media
on
June 30, 2026
Rating:
Reviewed by Bengal Media
on
June 30, 2026
Rating:

No comments: